“রাগী মানুষের মন ভালো হয়” খুবই অশ্লীল একটা কথা।

“রাগী মানুষের মন ভালো হয়” কথাটা খুবই অশ্লীল একটা কথা। এবং এই জঘন্য কথা দিয়ে রাগকে গ্লোরিফাই করা বন্ধ হওয়া উচিত।

রাগ ভালো কোন জিনিস না। রাগের সাথে মনের কোনো সম্পর্কও নাই। বরং অতিরিক্ত রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য মানুষ পশুর চেয়েও খারাপ।

ধারণা করি, “রাগী মানুষের মন ভালো হয়” কথাটার প্রচলন করা হয়েছিলো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সকে জাস্টিফাই করার জন্য। আমাদের দাদার প্রজন্ম বা আমাদের বাবার প্রজন্ম বৌ পেটানোর পর বা ছেলে-মেয়েকে পেটানোর পর এই কথাটা ইউজ করতো। নিজের কুকর্মের দায় তারা চাপাতেন রাগের উপর। নারী-পুরুষ উভয়ই।

আবার সাধারণত নির্যাতিত হওয়ার পরেও ঘরের বৌ বা ছেলে-মেয়ের জবাব হতো এমন, আমার বাবার রাগটা একটু বেশি, কিন্তু মনটা অনেক ভালো।

রাগের মাথায় বৌ পেটানো, বাচ্চা পেটানো, ছাত্র-ছাত্রী পেটানো, এমনকি রাগের মাথায় তিন ত্বালাক দেওয়া, এই “রাগের” দোহাই দিয়ে কোন আকাম বা কুকর্মটা করতে বাকি রাখি আমরা?

আপনার বাবা-মা হোক আর দাদা-দাদী হোক, রাগী যেই হোক না কেন, তাকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলতে হবে, রাগ একটা খারাপ জিনিস, বাজে জিনিস, অশ্লীল জিনিস। এটা ভালো মানুষের গুন না।

যারা বলেন, “আমার রাগ অনেক বেশী, মুখে যা আসে বলে ফেলি, আমি স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড কথা বলা পছন্দ করি। আপনি কষ্ট পেলে পান, তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। কিন্তু আমি মানুষ অনেক ভালো, মন পরিষ্কার, মনে কিছু রাখি না।”

ভাইরে ভাই! একটু থামেন। অনেক হইছে, ভালো ব্যবহার করতে জানেন না, নিজের রাগ, আচার-ব্যবহার কন্ট্রোল করা শিখেন নাই, এটা মানতে এত কষ্ট হয় কেন?
ভেবে দেখেন, আপনার নিজের সাথে কেউ এমন আচরণ করলে তখন কেন সহ্য করতে পারেন না?
অন্যদিকে আপনার উপর মেজাজ খারাপ হলেও, যে ভালো আচরণ করতে পারে, সে যে মনে কিছু রেখেছে বা তার মন অপরিষ্কার এটাইবা আপনি বুঝলেন কিভাবে ? ভাই! গায়েব জানেন নাকি?!
জীবন তো হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস না!
আপনি মনের মধ্যে কি গুপ্তধন- সাইফার কোড লুকিয়ে রেখেছেন, সেটা মানুষ কি করে বুঝবে? মানুষ তো আপনার আচরণ দিয়েই আপনাকে জাজ করবে!
যাই ভাবেন, সেটাই আচরনে প্রকাশ করতে হবে এমন তো কোন কথা নাই, একটু কষ্ট করে হলেও আচরণ ভালো করার সাধনা করেন, আস্তে আস্তে প্রাক্টিস করা শুরু করেন।

নিজের চেষ্টায়, পরিবারের চেষ্টায়, ধর্মীয় ভাবে বা সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাহায্য নিয়ে রাগ কমিয়ে ফেলা যায়।

রাগের মাথায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলাও একটা মানসিক অসুস্থতা। একটা মানসিক অসুস্থতাকে সুন্দর মনের দোহাই দিয়ে গ্লোরিফাই করে উল্টা পাল্টা কথা ছড়ানো বন্ধ করেন। 🙏

আসুন জেনে নেই অতিরিক্ত রাগ নিয়ে ইসলাম কি বলে-

“রাগ শয়তানের প্রবেশদ্বার”! তাই রাগ, পাপ কাজের দ্বার উন্মুক্ত করে।
মানুষ মাত্রই তার রাগ-ক্রোধ থাকবেই। নবীজি (সাঃ) বলেছেন, “আদম সন্তানের অন্তর একটি উত্তপ্ত কয়লা।” (তিরমিজি)
”রাগ” মানব চরিত্রের আখলাকে যামিমার (অসচ্চরিত্র) অন্তর্ভুক্ত।
আপনি নিজেকে অতিরিক্ত রাগান্বিত করছেন বলেই, শয়তান আপনার ভেতরে প্রবেশের পথ পেয়েছে।
কিন্তু এ রাগ যে দমন করতে পারে, রাগের সময় নিজের মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে, নিজেকে সংযত রাখে- সেই প্রকৃত বীর এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি। রাগের মাথায় নিজের ক্ষতি করে পরবর্তীতে আফসোস করা বুদ্ধিমানের পরিচায়ক নয়। কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো না।

“যেসব অতিরিক্ত কাজ/জিনিস সর্বকুলে ক্ষতিকর, তাই হারাম বলে গণ্য।”
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
“সে প্রকৃত বীর নয় যে কুস্তিতে নেমে অন্যকে ধরাশায়ী করতে পারে; বরং সে-ই প্রকৃত বীর যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” [বুখারী : ৬১১৪]

অতিরিক্ত রাগের সময় শয়তান মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে খেলা করে, শয়তান তখন মানুষকে দিয়ে এমন কিছু করিয়ে নেয় যা সে স্বাভাবিক অবস্থায় মোটেও করত না। সর্বত্র বিশৃঙ্খলা ও অমানবিকতা সৃষ্টি করে। রাগ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কেননা অত্যাধিক রাগ শরীরের নিয়ন্ত্রক মস্তিষ্কে আঘাত হানে। ফলে তা বহুমূত্র, রক্তচাপ ও হার্টের দুর্বলতাসহ অনেক রোগের কারণ হয়।
এ কারণেই রাসূল (সাঃ)-কে বারবার প্রশ্ন করা সত্ত্বেও রাগ দমনের উপদেশ দিয়েছেন এই হাদিসে—
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দরবারে এসে বললেন, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। রাসূল (সাঃ) বললেন, “রাগান্বিত হয়ো না”। সে ব্যক্তি বারবার উপদেশ চাইলে রাসূল (একই উত্তর দিয়ে) তাকে বললেন, “রাগান্বিত হয়ো না”। [বুখারী : ৫৬৫১]

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ {সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪}

নবীজি (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন।” (ইবনে মাজাহ: ৪১৮৬)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।’ (ইবনে মাজাহ: ৪১৮৯)।

নবী করিম (সা.) আমাদের উপদেশ হিসেবে আরও বলেছেন রাগান্বিত অবস্থায় অজু করতে, যা রাগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার একটি উত্তম পদ্ধতি।

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমি এমন একটি কালেমা জানি, যা পাঠ করলে ক্রোধ দূর হয়ে যায়। (আর তা হলো) “আউযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইত্বনির রাজিম” অর্থাৎ, আমি বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’ (মুসলিম, অধ্যায়: ৩২, হাদিস: ৬৩১৭)।

রাগ থেকে বাঁচার আরও কিছু উপায় :
(১) যে সমস্ত কারণে রাগ সৃষ্টি হয় সেগুলো থেকে দূরে থাকা, চুপ হয়ে থাকা, সে স্থান হতে প্রস্থান করা।
(২) মুখ ও অন্তর দ্বারা আল্লাহর জিকির করা। কেননা, ক্রোধ হল শয়তানের কুপ্রভাবের বিষক্রিয়া।
(৩) ক্রোধ পরিত্যাগ ও মানুষকে ক্ষমার সওয়াবের কথা স্মরণ করা এবং এর মন্দ পরিণতির কথা স্মরণ করা।
(৪) ক্রুদ্ধ ব্যক্তির অবস্থান পরিবর্তন করা, দাঁড়িয়ে থাকলে বসে অথবা বসে থাকলে শুয়ে পরা।

আমরা বেশি বেশি করে, “আউযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইত্বনির রাজিম” পড়ব।

লিখা : (সংগৃহীত )

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started